শিরোনাম :

কৃষকেরা না হাসলে আমরা হাসতে পারব না।

প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৪ ১৯:৩৮:২১ || আপডেট: ২০২০-০৫-০২ ০৬:৪৯:৪০

হাওরে এখন চলছে বোরো ধান কাটার মৌসুম। করোনাভাইরাসে স্থবির এই সময়ে একদিকে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট, অন্যদিকে আগাম বন্যার বার্তায় কৃষকেরা তাঁদের জমির ধান গোলায় তোলা নিয়ে চিন্তিত। এ অবস্থায় ছাত্র-শিক্ষক, স্কাউটস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, পুলিশ, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাংসদ—সবাই এখন হাওরে যাচ্ছেন। ধান কাটায় উৎসাহ দিচ্ছেন কৃষকদের। জমিতে নেমে কৃষকদের ধানও কেটে দিচ্ছেন তাঁরা।

কৃষি ও কৃষকের সহযোগিতায় প্রশাসনের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের পক্ষ থেকে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। টিআইবির সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি ধূর্জটি কুমার বসু বলেন, ‘গত কয়েক দিন থেকেই বিষয়টি লক্ষ করছি। হাওরে নানা শ্রেণি–পেশার লোকজন যাচ্ছেন। এতে নিশ্চয়ই আমাদের কৃষক ভাইয়েরা উৎসাহ পাবেন। তাঁরা কে কতটুকু ধান কাটলেন সেটার চেয়ে বড় হলো তাঁরা হাওরে গেছেন, কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটি অত্যন্ত ভালো দিক। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কৃষকেরা না হাসলে আমরা হাসতে পারব না।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরে এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ মেট্রিক টন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় গড়ে ৩৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। হাওরের পুরো ধান কাটতে আরও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে।

সুনামগঞ্জের হাওরে এখন কৃষকের মনে ভয় একটাই, সেটা হলো আগাম বন্যা। হাওর এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের মেঘালয়ে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টি হবে। তাই যেকোনো সময় হাওরে ঢল নেমে বন্যা হতে পারে। তলিয়ে যেতে পারে বোরো ধান। এই আশঙ্কায় কৃষকেরা যে যেভাবে পারছেন, জমির ধান কাটছেন। কেউ কেউ আধাপাকা ধানও কেটে ফেলছেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত হাওরের ধান কাটতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে বেকার হয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষদের ধান কাটায় যুক্ত করা হচ্ছে। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ত্রাণের বিনিময়ে ধান কাটানোর। এ অবস্থায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক–শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার লোকজন কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা হাওরে ধান কাটছেন। কৃষকদের সাহস জোগাচ্ছেন। ধান কাটায় অংশ নিচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারাও। হাওরে ধান কাটায় অংশ নিতে এবং কৃষকদের সহযোগিতা করতে কৃষক লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উপজেলায় ধান কাটা হচ্ছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের পক্ষ থেকে সিলেটে বিভাগের জন্য গঠিত কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামীমা শাহরিয়ারকে। তিনি সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ এবং সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

সাংসদ শামীমা শাহরিয়ার বলেন, গত মঙ্গলবার থেকে তাঁরা সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় হাওরে কৃষকদের ধান কেটে দিচ্ছেন। তিনি নিজে জামালগঞ্জ, সদর ও তাহিরপুর উপজেলায় উপস্থিত থেকে নেতা-কর্মীদের এ কাজে উৎসাহ দিয়েছেন। প্রতিটি উপজেলায় ধান কাটার জন্য কমিটি করা হয়েছে। একটি হট লাইন চালু করা হয়েছে সংগঠনের পক্ষ থেকে। এই নম্বরে যোগাযোগ করলে তাঁরা ধান কেটে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। হাওরের পুরো ফসল তোলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা মাঠে থাকবেন।

জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক খায়রুল হুদা বলেন, তাঁরাও গত মঙ্গলবার প্রথমে সদর উপজেলার দেখার হাওরে কৃষকের ধান কেটে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এখন বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিদিনই নেতা-কর্মীরা ধান কাটায় অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া দল বেঁধে বিভিন্ন উপজেলায় হাওরে ধান কাটায় অংশ নিচ্ছেন জেলা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো হাওরে ধান কাটছেন। ধান কাটায় অংশ নিয়েছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরাও।

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দীপঙ্কর কান্তি দে ও সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান বলেন, তাঁরা সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় হাওরে ধান কাটায় নেমেছেন। জেলা প্রতিটি উপজেলায় তাদের নেতা-কর্মীরা কৃষকদের ধান কাটা সহায়তা করছেন। তাঁরা নিজেরাও মাঠে আছেন।

ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের জেলার তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরে বৃহস্পতিবার ধান কাটতে দেখা গেছে। জেলা ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা কয়েক দিন থেকে তাহিরপুর উপজেলায় কৃষকদের ধান কাটায় সহযোগিতা করছেন।

এ ছাড়া মাঠে ঘুরেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এনামুল কবিরও। তিনি বলেন, হাওরে এই সময়টায় এমনিতেই কৃষক পরিবারের সবাই মাঠে থাকেন। ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ করেন। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, রয়েছে বন্যার আশঙ্কা। তাই সবাইকে মাঠে নামতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হাওরে কৃষকদের ধান কাটার বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, ‘আমরা সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছি কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সুনামগঞ্জের মানুষ সেটাই করছেন। সবাই মিলে চেষ্টা করলে অবশ্যই দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হবে। আর ধান গোলায় তুলতে পারলেই হাওরে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে।’

ট্যাগ :

কৃষক কৃষি